নিজস্ব প্রতিনিধি :
রাজধানীর ধানমন্ডির বাংলাদেশ কাউন্সিল অফ সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) সাইন্সল্যাব নামে পরিচিত এর জামে মসজিদের খতীব মুফতি শামছুদ্দোহা আশরাফীকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-১০ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিসিএসআইআরের আবাসিক বাশিন্ধাদের মারফত জানা যায়, দীর্ঘ একযুগ ধরে মসজিদটির খতীবের দায়িত্ব পালন করছিলেন মুফতি শামছুদ্দোহা। ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ তাকে আকস্মিকভাবে এই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় মুফতি শামছুদ্দোহা নিজেই ফেসবুকে একটি পোস্টে এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।
অব্যাহতির পেছনে কি ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’?
মুফতি শামছুদ্দোহা তার পোস্টে লিখেছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে (সাইন্সল্যাব) প্রায় ১১ বছর যাবত সময় দিলেও তাকে ‘নির্বাচন করার অপরাধে’ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই সিদ্ধান্তে কোনো নিয়ম মানা হয়নি, দেখানো হয়নি সামান্য সৌজন্যতাও।
তার বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, মসজিদ কমিটির সভাপতি ও জামায়াত নেতা বিসিএসআইআর এর চিফ সাইন্টিফিক অফিসার হোসেন সোহরাব ও তার সহযোগীরা বিশেষ রাজনৈতিক দলের (জামায়াত) প্রতি সমর্থন জানান এবং ইসলামী আন্দোলনের সাথে ঐক্য ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই তার প্রতি ‘কাঠারভাবে’ লেগে থাকে এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধ মূলুক এই ধরনের পদক্ষেপ নেন। এমনকি গতকাল মসজিদের টয়লেটের চাবি পর্যন্ত তাকে ব্যবহার করতে বাধা দেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অব্যাহতি দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই আলেম। তিনি জানান, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অব্যাহতিপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়। এর আগে জুমার নামাজ পড়াতে এসে তাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। নামাজের পর তিনি মসজিদের সভাপতি ও জামাত নেতা হোসাইন সোহরাব এর সাথে দেখা করতে চাইলেও কেউ তার সাথে সৌজন্যতা দেখিয়ে কথা বলেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে ফোন দিলেও সভাপতি তা রিসিভ করেননি। তিনি আরো জানান জুম্মার নামাজ শেষে আমি আমার ব্যক্তিগত রুমে প্রবেশ করতে চাইলে মসজিদের খতিব সাহেব বলেন রুমের চাবি সভাপতি মহোদয়ের কাছে ।আপনাকে রুমে ঢুকতে নিষেধ করেছে! কথাগুলো শুনে নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। অজু করে মসজিদে প্রবেশ করে দু রাকাত নামাজ আদায় করে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করলাম।
এই ঘটনায় তিনি নীরব না থেকে আইনি লড়াই করার ঘোষণা দিয়েছেন। মুফতি শামছুদ্দোহা বলেন, “আমি এ বিষয়টা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি, ইনশাআল্লাহ। এটা আমার চাকুরী ফিরে পাওয়ার জন্যই নয় শুধু, বরং গোটা আলেম সমাজের হাত-পা বেঁধে ফেলার কিংবা বলয়টা (চক্র) নিয়মনীতির বিরুদ্ধে।”
ঘটনাটি সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ওয়ালী উল্লাহ আরমান নামের একজন ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন, “কোন দেশে বসবাস করছি, কাদের পিছনে সময় দিছি?” শিরোনামে একটি পোস্টে তিনি রাজনৈতিক কারণে একজন ইমামকে অপসারণের নিন্দা জানিয়েছেন।
অন্য এক পোস্টে মোঃ সরুজ হোসেন নামের একজন ব্যবহারকারী এই ঘটনাকে ‘জামায়াতের প্রতিহিংসা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, “এই সেই মাথামোটা লোক… জামায়াত নেতা, হাতপাখায় নির্বাচন করার কারণে মসজিদ থেকে তাকে চাকুরিচ্যুত করে দিয়েছে জামায়াতে এই লোকটি।” তিনি এই সিদ্ধান্তের জন্য জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
এদিকে, ফেসবুকে প্রচারিত একটি ভিডিওর ক্যাপশন থেকে জানা যায়, এই বিষয়ে ‘শানে সাহাবা’ সংগঠন ইতিমধ্যে আইনি পদক্ষেপ শুরু করেছে। মাওলানা আব্দুস সালাম আশরাফীর একটি পোস্টের সূত্র ধরে বলা হচ্ছে, এ ঘটনায় আইনি লড়াই চলবে।
উল্লেখ্য, মুফতি শামছুদ্দোহা আশরাফী শুধু একজন খতীবই নন, তিনি কুমিল্লা-১০ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এই নির্বাচনী সম্পৃক্ততাকেই তার চাকরিচ্যুতির মূল কারণ বলে মনে করছেন তার অনুসারী ও সমর্থকরা। এই ঘটনা দেশের মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাব কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।