অনলাইন ডেস্ক :
আজ ১৭ মার্চ, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। ১৯২০ সালের এই দিনে ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে।
শৈশব থেকেই নেতৃত্বগুণ, সাহসিকতা এবং মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতার জন্য পরিচিত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ব্রিটিশ শাসনামল থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। বাঙালির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি বারবার কারাবরণ করেছেন, কিন্তু আন্দোলন থেকে কখনও পিছিয়ে যাননি।
১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি উপস্থাপন করেন, যা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে নতুন শক্তি দেয়। ১৯৬৮ সালে তাঁকে ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’-র প্রধান আসামি করা হয়। তবে ১৯৬৯ সালের তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে পাকিস্তান সরকার ওই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারাগার থেকে মুক্তির পর ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-জনতা তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে ঐক্যবদ্ধ করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে (২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তবে গ্রেপ্তারের ঠিক আগেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন এবং তাঁর নামেই দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তবে তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম এবং নেতৃত্ব বাঙালি জাতির ইতিহাসে আজও গভীরভাবে প্রোথিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর জন্মদিন বাঙালির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও অনুপ্রেরণার দিন হিসেবে বিবেচিত হয়।