অনলাইন ডেস্ক :
২০ হাজার নিয়োগই দলীয় কোটায়: ব্যাংকটির বর্তমান ২০,১১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রায় সবাই জামাত-শিবির কোটায় এবং সংশ্লিষ্ট জেলা আমীরের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত।
পদ দখলে ৩য় বিভাগ প্রাপ্তরা: ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকা ১৭,২২১ জন কর্মকর্তা তাদের শিক্ষা জীবনে ৩য় বিভাগ প্রাপ্ত। বর্তমানে তারাই উইং প্রধান বা ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবীদের উপেক্ষা: যেখানে ১৬,৮৮৮ জনকে মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সারা দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৩২৩ জন।
৫,৫০০ দক্ষ কর্মকর্তাকে ছাঁটাই: গত দেড় বছরে ৫,৫০০ জন মেধাবী কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩,২১১ জনই ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রিধারী এবং কেউই ৩য় বিভাগ প্রাপ্ত ছিলেন না।
রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ‘ট্যাগ’ ব্যবহার: ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তাদের ‘ছাত্রলীগ’, ‘বিএনপি’ কিংবা ‘পটিয়া’র তকমা দিয়ে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের কর্মকর্তাদের ‘পটিয়া গ্রুপ’ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
টার্মিনেশনের নীল নকশা: অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অযোগ্যদের সুরক্ষা দিতে এবং অন্যদের ছেঁটে ফেলতে বিশেষ পরীক্ষার আয়োজন করা হয়। যোগ্য কর্মকর্তাদের ভাষায় এটি ছিল একটি ‘টার্মিনেশন নীল নকশা’, যার প্রতিবাদ করায় অনেক মেধাবী কর্মকর্তাকে সবার আগে চাকরি হারাতে হয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি’ (IBBL) নিয়ে একটি অডিট ফার্মের প্রতিবেদনে ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বছরের পর বছর ধরে ব্যাংকটিতে মেধার পরিবর্তে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক কোটায় নিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির ২০ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয়ের (জামাত-শিবির) অনুসারী এবং তাদের বড় একটি অংশই শিক্ষাগতভাবে অযোগ্য।
৩য় বিভাগ প্রাপ্তদের জয়জয়কার, বঞ্চিত মেধাবীরা:
অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ২০,১১১ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৭,২২১ জনই তাদের শিক্ষা জীবনে অন্তত একটি ৩য় বিভাগ প্রাপ্ত। যেখানে দেশের ব্যাংকিং খাতে মেধার তীব্র লড়াই চলে, সেখানে ৩য় বিভাগ প্রাপ্ত বিশাল এই জনগোষ্ঠী বর্তমানে ব্যাংকটির ম্যানেজার ও উইং প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন।
বিস্ময়করভাবে দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের মেধাবীদের নিয়োগের হার নামমাত্র। অডিট প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কেন বছরের পর বছর মেধার অবমূল্যায়ন করে শুধুমাত্র দলীয় প্রশংসাপত্রের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলো।
টার্মিনেশনের ‘নীল নকশা’ ও মেধা নিধন:
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত দেড় বছরে প্রায় ৫,৫০০ মেধাবী ও চোকস কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৩,২১১ জনই দেশের খ্যাতনামা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী এবং তাদের কারোরই ৩য় বিভাগ ছিল না। এদের মধ্যে অনেকে নিজ নিজ বিভাগে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ছিলেন।
রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সময়ে ‘ছাত্রলীগ’, ‘বিএনপি’ বা ‘আঞ্চলিকতা’র (পটিয়া গ্রুপ) তকমা দিয়ে এই কর্মকর্তাদের ব্যাংক ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। মূলত ব্যাংকের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ চালানো হয় বলে অডিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এস. আলম গ্রুপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি এস. আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ওই সময় থেকেই ব্যাংকের নিয়োগ ও ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের ‘পটিয়া’ এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে নামমাত্র যোগ্যতায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও তখন তীব্র ছিল।
সম্প্রতি (৫ আগস্ট, ২০২৪) রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমান পর্ষদ এস. আলম গ্রুপের সময়কার বেনামি ঋণ এবং বিতর্কিত নিয়োগগুলো খতিয়ে দেখছে। অডিট ফার্মের এই প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এল যখন ব্যাংকটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, একটি জাতীয় স্তরের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এভাবে দলীয় ক্যাডার ভিত্তিক নিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মেধাবীদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের হাতে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব থাকায় ব্যাংকটি তার দীর্ঘদিনের গৌরব হারিয়েছে। প্রতিবেদনে এই প্রক্রিয়াকে ‘৭১-এর বুদ্ধিজীবী হত্যার আধুনিক সংস্করণ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যেখানে মেধা ও ন্যায়বিচারকে সুকৌশলে সমাহিত করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠানে যদি যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বড় হয়, তবে আমানতকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে। অবিলম্বে এই তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার দাবি উঠেছে।
#জামায়ত #ইসালামীব্যাংক